গর্ভাবস্থায় মা ও সন্তানের সঠিক খাবার , দেখে নিন সেগুলি

গর্ভাবস্থার শুরুতে বাড়ির বড়রা বা ডাক্তার অনেক খাবার খেতে বারণ করেন। কিন্তু এই অবস্থায় নানা রকমের খাবার খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। গর্ভাবস্থায় হবু মায়ের শরীরে হরমোনের খামখেয়ালীপনার জন্য এই প্রবণতা দেখা যায়। তবে সেই ইচ্ছে সবসময় পূরণ হয় না ডাক্তারের পরামর্শে বা বাড়ির বড়দের পরামর্শে। তবে তারা সঠিক জিনিসটি জানান আপনার ভালোর জন্যই। এবারে জেনে নিন কোন কোন খাবারগুলি গর্ভাবস্থায় না খাওয়াই ভালো। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস কোন খাবারগুলি এড়িয়ে চলাই ভালো (Foods To Avoid During Pregnancy)।

হাফ বয়েল ডিম: গর্ভাবস্থায় কাঁচা অথবা আধ সেদ্ধ ডিম না খাওয়াই ভালো। ডিমে থাকা সালমনেল্লা ভাইরাস সংক্রমণ হলে মায়ের ডায়রিয়া, ফুডপয়জনিং, জ্বর, বমি, মাথা ঘোরা এবং পেটে ব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে। গর্ভস্থ শিশুর প্রত্যক্ষভাবে কোন সমস্যা না হলেও মায়ের অসুস্থতার কারণে অসুবিধা হতে পারে। সে কারণেই কাঁচা ডিম এড়িয়ে চলতে হবে। সেক্ষেত্রে ডিমযুক্ত খাবার যেমন মেয়োনিজ, কাস্টার্ড ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো। কারণ এগুলিতে কাঁচা ডিম মেশানো থাকে। সেক্ষেত্রে রান্না করা ডিম অবশ্যই খেতে পারেন।

অর্ধেক বা আধা সেদ্ধ চিংড়ি মাছ:
বাইরে বা রাস্তার দোকানে চিংড়িমাছ রান্না করলে তা অনেক সময় পুরোপুরি সেদ্ধ হয় না এবং ভালো‌ভাবে পরিষ্কার করা হয় না। চিংড়ি মাছ প্রোটিন ও ওমেগা থ্রি-এর উৎকৃষ্ট উৎস হলেও আধ সেদ্ধ চিংড়ি মাছ গর্ভাবস্থায় মায়ের পেটের সমস্যার কারণ হতে পারে। ভালো করে রান্না করা না হলে চিংড়ি মাছে থাকা প্যারাসাইট শরীরের ক্ষতি করে। এছাড়া চিংড়ি মাছে অ্যালার্জি হওয়ার মতো বিভিন্ন উপাদান থাকে যা গর্ভবতী মায়ের অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে। চিংড়ি বা যেকোনো সামুদ্রিক মাছ অর্ধেক রান্না করে খেলে লিস্টোরিয়া নামক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে রক্ত দূষিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। যা গর্ভস্থ ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে।

আধ সেদ্ধ মাংস:
গর্ভাবস্থায় আধ সেদ্ধ মাংস এড়িয়ে চলাই ভালো। মাংস পুরোপুরি রান্না না হলে এতে সালমনেল্লা, ই-কোলাই ইত্যাদি মাইক্রোঅরগানিজম নষ্ট হয় না। এর ফলে মারাত্মক ফুড পয়জনিং হতে পারে। যা গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে।

কাঁচা সবজি খাওয়া: গর্ভাবস্থায় কাঁচা সবজি খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। সবজি ভালো করে রান্না করে খাওয়াই বিধিসম্মত। কাঁচা সবজির মধ‍্যে বিভিন্ন প্যারাসাইট বা পরজীবী ব্যাকটেরিয়া থাকে। এগুলি গর্ভস্থ শিশু এবং মায়ের ক্ষতি করতে পারে। বাজার থেকে কিনে আনা কাটা ফল বা সবজি খাওয়া উচিত নয়। তাজা শাকসবজি রান্না করে খাওয়াই উচিত এবং অবশ্যই রান্না করার আগে পরিষ্কার করে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

আনারস খাওয়া: গর্ভাবস্থায় আনারস খাওয়া যেতে পারে কিন্তু তা খুবই কম পরিমাণে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে। আনারসে উপস্থিত ব্রোমিলিন উৎসেচকের গর্ভপাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারে। যার ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে প্রথম তিন মাস এই ফল না খাওয়া উচিত।

কাঁচা পেঁপে:
গর্ভাবস্থায় কাঁচা পেঁপে একেবারেই খাওয়া উচিত নয়। কাঁচা পেঁপের পেপসিন ও প‍্যাপাইন ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে। গর্ভপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

মৌরি ও মেথি:
রান্নায় আমরা সকলেই মেথির বা মৌরির দানা ব্যবহার করে থাকি। অল্প পরিমাণে রান্নায় ব্যবহার করলে কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে মৌরি বা মেথির দানা খেলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রসবের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে প্রিম্যাচিউর বাচ্চার জন্ম হয়। তাই অতিরিক্ত পরিমাণে প্রত্যেকদিন মৌরি খাওয়া থেকে বিরত থাকাই উচিত।

আজিনামোটো:
চাইনিজ খাবারে ব্যবহৃত আজিনামোটো গর্ভাবস্থায় সমস্যা সৃষ্টি করে। আজিনামোটো দেওয়া খাবার গ্রহণে অনেক সময় মাথা ঘোরা, পেশিতে টান এবং প্রচন্ড হঠাৎ করে ঘেমে যাওয়ার মত সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় আজিনামোটো যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।

আনপাস্তুরাইজ দুধ: আনপাস্তুরাইজ দুধে বিভিন্ন রকম মাইক্রোবস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে। তাই আনপাস্তুরাইজ দুধ এড়িয়ে চলা ভালো এবং দুধ খেলে তা ভালো করে ফুটিয়ে বা পাস্তুরাইজ দুধ খান।

অ্যালকোহল:
গর্ভাবস্থায় কোনভাবেই মদ্যপান বা অ্যালকোহল সেবন করা উচিত নয়। অ্যালকোহল মায়ের শরীর থেকে গর্ভস্থ শিশুর মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে। এর ফলে শিশুর মস্তিষ্ক এবং শিরদাঁড়ার ক্ষতি হয়। তাই শিশুর ভালোর জন্য অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে।

এছাড়া গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত মশলাযুক্ত ভাজাভুজি খাবার, এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। সহজপাচ্য বা সহজে হজম হয় এরকম খাবারই খাওয়া উচিত। যেকোনো খাবার খাওয়ার পরে অসুবিধা হলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার খাওয়া বাঞ্ছনীয়।

প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাসমূহ (Myths During Pregnancy):

এছাড়াও গর্ভাবস্থায় খাওয়া নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। যারা বাড়ির বয়ঃজ্যেষ্ঠ, গর্ভবস্থায় হবু মাকে অনেক খাবার খেতে নিষেধ করেন। সেগুলি হল:

★ বেশি খাবার খেলে সন্তান বড় হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে এবং তার ফলে সিজার করতে হবে। এই ভয়ে অনেকেই মাকে বাড়তি খাবার দেন না। তার ফলে মা অপুষ্টিতে ভোগেন এবং কম ওজন সম্পন্ন শিশুর জন্ম দেন।

★ মৃগেল মাছ খেলে গর্ভস্থ শিশুর মৃগীরোগ হতে পারে। এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে।

★ বোয়াল মাছ খেলে সন্তানের চোয়াল বড় হয়। এরকম ভ্রান্ত ধারণাও দেখা যায়।

★ গর্ভবতী মাকে সন্তানের দেহ সর্পাকৃতি হ‌ওয়ার আশঙ্কা‌য় শিঙি বা শোল মাছ খেতে দেওয়া হয় না।

★ শসা জাতীয় খাবার খেলে সন্তানের চামড়া ফাটা ফাটা হতে পারে ভেবে এ ধরনের খাবার খেতে দেওয়া হয়না।

★ সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় মাকে না খাইয়ে রাখার মতো কুসংস্কার দেখা যায়।

এই ধারণাগুলি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং এর ফলে হবু মায়েরা গর্ভাবস্থায় অপুষ্টিতে ভোগেন। যার ফলে গর্ভস্থ সন্তান অপুষ্টি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। সেক্ষেত্রে একমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করাই শ্রেয়।